জাল ওষুধের রমরমা।

একা রামে রক্ষা নেই, সুগ্রীব দোসর। কথাটা বোধহয় এক্ষেত্রে একেবারে যথার্থভাবে ধ্বনিত হয়।গত কয়দিন ধরেই দেশজুড়ে জাল ওষুধের খবর বিভিন্ন মিডিয়া মারফত জানা যাচ্ছে। একেই তো দেশের এক বিশাল অংশের মানুষ রোগে জর্জরিত।এর উপর মানুষ যখন ওষুধ খেয়ে কিছুদিন বেঁচে থাকার আশা করছে, এমন সময় জাল ওষুধ, ভেজাল ওষুধের রমরমার কথাও দেশব্যাপী চর্চিত হচ্ছে।তা মানুষ যাবে কোথায়। অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা ব্যবস্থা কর্পোরেট হাসপাতালগুলির দৌলতে এখন সাধারণ মানুষের নাগালের প্রায় বাইরে চলে যাচ্ছে। তাও সরকার জনৌষধি,হেলথ্ ইনশিয়োরেন্স পলিসি, আয়ুষ্মান, জন আরোগ্য যোজনা ইত্যাদি চালু করে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কিছুটা লাঘব করার চেষ্টায় রয়েছে। এই অবস্থায় মানুষ যা কিছুই সাহায্য সহায়তা পাচ্ছে তা আবার ভেজাল ওষুধ জাল ওষুধের খপ্পরে পড়ে সাধারণ মানুষের একেবারে দফারফা অবস্থা। জাল ওষুধের কারবারিরা গোটা দেশেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এমনকী বিদেশ থেকেও এদেশে জাল ওষুধ ঢুকছে। মানুষ সেগুলি গ্রহণ করছে।
কিন্তু কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। এমনিতেই অ্যালোপ্যাথিতে বহু নামি, অনামি কোম্পানির ওষুধ নিয়ে নানা সময়ে নানা অভিযোগ উঠে।হাতেগোনা কিছু নানা ব্র্যান্ডে কোম্পানির পাশে এদেশে,রাজ্যে রাজ্যে গজিয়ে ওঠা ভেজাল, অনামি এবং বিনা কাজের ওষুধ কোম্পানিগুলি মুনাফা লাভের জন্য মুড়িমুড়কির মতো ওষুধ তৈরি করেই চলছে।আর সাধারণ মানুষ না জেনে না শুনে এই ওষুধগুলি গ্রহণ করেই চলেছে।এর সাথে একশ্রেণীর অনৈতিক চিকিৎসকরা যে জড়িত নন তা নয়।মুনাফার লোভে এখন ড্রাগ মাফিয়ার, কর্পোরেট হাসপাতাল, একাংশ চিকিৎসক, প্যারামেডিক্স, সবাই জড়িত হয়ে গেছে। আর সর্বস্বান্ত হচ্ছেন সাধারণ থেকে একেবারে সাধারণ মানুষ। এবার কিছুদিন আগে কলকাতায় এক নয়া জালিয়াতি চক্রের পর্দা ফাঁস হয়েছে। জাল ওষুধের তদন্তে নেমে তদন্তকারীদের চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গেছে। দেখা গেছে, নেলপলিশ তোলার রিমুভার দিয়ে ওষুধের এক্সপায়ারি ডেট মুছে নয়া তারিখ বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ক্রেতারা অজান্তেই এক্সপায়ারি ডেট আছে জেনেই তা কিনছে এবং খাচ্ছে। আসলে ক্রেতারা ভেজাল ওষুধ কিনছে এবং খাচ্ছে। কলকাতায় সম্প্রতি ২ কোটি টাকার এ ধরনের ভেজাল ওষুধ উদ্ধার করা হয়েছে। এরপর তদন্তে নেমে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছে যে, এর জাল দিল্লী থেকে উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা থেকে রাজস্থান, বিহার, ঝাড়খণ্ড সবখানেই বিস্তৃত।
শুধু তাই নয়,কেন্দ্র এবং রাজ্যে রাজ্যে ড্রাগ কন্ট্রোলের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে ড্রাগ মাফিয়ারা তাদের জাল গোটা দেশেই ছড়িয়ে দিয়েছে। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে জাল ওষুধ তৈরিতে।
বিশেষ করে করোনা পরবর্তী সময়ে এই জাল ওষুধের রমরমা বহগুন বেড়েছে। আগে যেখানে নামি ব্র্যান্ডেড কোম্পানির ওষুধ কম হারে জাল হতো এখন তা ২০%-২৫% হারে হচ্ছে। এছাড়া প্যারাসিটামল, অ্যান্টিবায়োটিক, রক্তচাপ, সুগারের ওষুধ-যে ওষুধের চাহিদা বেশি রয়েছে তা জাল হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।
বাস, ট্রেন, নদীপথে এই ওষুধ রাজ্যে রাজ্যে ঢুকছে। অর্থাৎ দিনরাত ভেজাল ওষুধের কারবারিরা সক্রিয়। সম্প্রতি আরও এক চাঞ্চল্যকর তথ্যও জানা গেছে। খোদ কলকাতার বুকে একটি ওষুধের গুদামে হানা দিয়ে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকার ভেজাল ক্যান্সারের ওষুধ আটক করেছে ড্রাগ কন্ট্রোলের লোকজন। তদন্তকারীরা জানিয়েছে এই ওষুধ বাংলাদেশ দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছে। অর্থাৎ চোরাচালানকারীরা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও সক্রিয়। প্রশ্ন হল, এভাবেআন্তর্জাতিক তথা দেশীয় জাল ওষুধ কারবারিরা যদি সক্রিয় থাকে এবং মুনাফা লাভের জন্য কোটি কোটি টাকার ভেজাল ব্যবসায় মত্ত হয়ে উঠে তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়? সাধারণ মানুষ একবার স্বাস্থ্য পরিষেবায় বঞ্চিত হবে অন্যদিকে, জাল ওষুধের খপ্পরে পড়বে। সরকার কি শুধুই নীরব দর্শক হয়ে থাকবে, সময় এসেছে গর্জে উঠার।জাল ওষুধ কারবারি ও ড্রাগ মাফিয়াদের বিরুদ্ধে কঠোর থেকে কঠোর তর ব্যবস্থা নেবার সময় এসে গেছে।