পূর্বোত্তরে কালো মেঘ!!
ভারতের পূর্বোত্তরের রাজ্যগুলোর মধ্যে আজ থেকে প্রায় ৬১ বছর আগে ১৯৬৩ সালের ১লা ডিসেম্বর নাগাল্যান্ডের ভারতভুক্তির ঘটনা ঘটেছিল।ভারত স্বাধীন হওয়ার পর যেসব অঙ্গ রাজ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ভয়াবহ হিংসাশ্রয়ী রূপ নিয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে পুরনো এবং প্রলম্বিত আন্দোলনের উৎস একটি যদি হয় জম্মু কাশ্মীর, তাহলে অপরটি হলো এই নাগাল্যাণ্ড।
দীর্ঘ বছর অনেকটাই স্তিমিত হয়ে যাওয়ার পর নাগা জঙ্গি সংগঠনের এক বিবৃতি নতুন করে সমস্যার বাঁক নিতে শুরু করায় দিল্লীর কেন্দ্রীয় সরকারের কপালে চিন্তার ভাঁজ বেড়েছে।এমনিতেই গত দেড় বছর ধরে উত্তর পূর্বের আরেক রাজ্য মণিপুরে দুই সম্প্রদায়ের জাতিহিংসা গোটা ভারতের উৎকণ্ঠাকে বাড়িয়ে দিয়েছে।যার এখনও কোনও নিরসন হয়নি।এই রকমই এক পরিস্থিতিতে মণিপুরের পর উত্তর পূর্বাঞ্চলের আরেক রাজ্যে জঙ্গি সংগঠনের হুমকি নিঃসন্দেহে কোনওভাবেই খাটো করে দেখার নয়।ঘটনা হল,নাগা জঙ্গিদের সশস্ত্র গোষ্ঠী এনএসসিএন আইজ্যাক মুইভার দল আবারও ভারতের বিরুদ্ধে নতুন করে হিংসা শুরু করার হুমকি দিয়েছে।১৯৯৭ সাল থেকে কেন্দ্রের সঙ্গে সংঘর্ষবিরতি চুক্তিতে রয়েছে এনএসসিএন (আইএম)। তারপর থেকে দফায় দফায় এই পর্যন্ত কেন্দ্রের সঙ্গে নাগা সশস্ত্র জঙ্গি গোষ্ঠীর অন্তত ৭০টি শান্তি আলোচনা বৈঠক হয়ে গেছে।সর্বশেষ ২০১৫ সালে বর্তমান কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন মোদি সরকারের সঙ্গে আরেকটি চুক্তি হয়েছিল নাগা জঙ্গিদের।এর ঠিক ৮ বছর বাদে সশস্ত্র নাগা জঙ্গিগোষ্ঠী এই প্রথম হিংসাত্মক প্রতিরোধের হুঁশিয়ারি দিয়ে প্রকাশ্যে বিবৃতি জারি করল।নাগা সশস্ত্র গোষ্ঠী একটি জাতীয় সংবাদপত্রে তাদের বিবৃতি পাঠিয়ে জানিয়েছে, তারা তাদের নিজেদের দাবিগুলো নিয়ে আলোচনার জন্য তৃতীয় কোনও পক্ষের সরাসরি হস্তক্ষেপ চায়।সেই সঙ্গে নাগাদের জন্য পৃথক সংবিধান এবং পৃথক পতাকার দাবির কথাও জানিয়েছে জঙ্গিগোষ্ঠীটি। গত বৃহস্পতিবার গোষ্ঠীটি তাদের বিবৃতি জারি করে বলেছে,২০১৫ সালের ৩ আগষ্ট কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে তাদের যে সর্বশেষ চুক্তিটি হয়েছে একে ভারত সরকার এবং সরকারের নেতৃত্ব সম্মান করছেন না। এই অবস্থায় এলাকায় হিংসাত্মক পরিস্থিতি ছড়ালে এর দায় সরকারের উপরই বর্তাবে।
এনএসসিএন (আইএম) গোষ্ঠীর জারি করা এই বার্তাটি যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই বার্তার মধ্য দিয়ে কার্যত দেশের সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ ও স্বাধীনতাকেও প্রশ্নচিহ্নে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।কারণ ভারতের অখণ্ডতা মেনে ভারতের অঙ্গরাজ্য হিসাবে অবস্থিত হয়েও জঙ্গি গোষ্ঠীটি যখন তাদের জন্য পৃথক সংবিধান ও পৃথক পতাকা দাবি করে তৃতীয় কোনও শক্তির হস্তক্ষেপের কথা বলছে, তখন বিষয়টিকে কোনওভাবে সরলীকরণ করার সুযোগ নেই।মনে রাখতে হবে,এনএসসিএনের দাবিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, বৃহত্তর নাগাল্যান্ড গঠন।আসাম, মণিপুর ও অরুণাচলপ্রদেশের নাগা অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোকে একত্রিত করে বৃহত্তর নাগাল্যাণ্ড গঠনের দাবি তাদের দীর্ঘদিনের।একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো,গত লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে মায়ানমারের সীমান্ত লাগোয়া পূর্ব নাগাল্যান্ডের ৬টি জেলাকে নিয়ে পৃথক রাজ্য গঠনের দাবিতে গত ৪-৫ বছর ধরেই আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিল এলাকায় বসবাসকারী সাতটি জনজাতি গোষ্ঠীর যুক্তমঞ্চ ইএনপিও।দিল্লীতে গিয়ে কেন্দ্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তারা এ নিয়ে বৈঠকও করেছে।২০২৩ সালে ফেব্রুয়ারীতে রাজ্যভাগের দাবিতে বিধানসভা নির্বাচন বয়কটের ডাক দিলেও শেষপর্যন্ত সরে এসেছিলেন ইএনপিও নেতৃত্ব।অভিযোগ হলো, এই ইএনপিও গোষ্ঠীর সাথে আইজ্যাক মুইভাদের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে।বলা হচ্ছে, গত তিনদিন আগে এনএসসিএন যে বিবৃতিটি ইস্যু করেছে সেটির খসড়া তৈরি করেছেন মুইভা গোষ্ঠীর দুই মাথা,যারা বর্তমানে চিনে অবস্থান করছেন।যদিও বিবৃতিতে সই রয়েছে সাধারণ সম্পাদক টি মুইভার।এটা সবারই জানা, আইজ্যাক মুইভার মতো নাগা নেতারা চিনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় সে দেশে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসে নাগাল্যাণ্ডে সশস্ত্র লড়াই শুরু করেছিল।যদিও বর্তমান পরিস্থিতিতে জঙ্গি সন্ত্রাসীরা হুমকি দিয়ে জঙ্গলে গিয়ে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করার অবস্থায় এনএসসিএন নেই। কিন্তু চিনের মদতে মণিপুরের পর এবার নাগাল্যান্ডের মাধ্যমে পূর্বোত্তরকে অশান্ত রাখার প্রস্তুতি যে শুরু হয়েছে সেটা এই ঘটনাপ্রবাহ থেকেই ইঙ্গিতমিলছে।